যে গ্রামের সবাই উচ্চ শিক্ষিত; সবাই উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা
মাহিরা তাসফি প্রভা,রূপগঞ্জ :
দুচোখ মেলে তাকালেই চোখে পড়বে সারি সারি গাছ, গ্রামের মেঠোপথ আর সবুজ ফসলি জমি। দুর থেকে তাকালে মনে হবে এটি কোন পর্যটন স্পট। স্বাধীনতা পূর্ববর্তি ১৯৬৩ইং সালে পুরো মৌজার এমনকি পুরো গ্রামের মালিক হয়ে যান রোহিলা গ্রামের তৎকালীন বাসিন্দা সুমির উদ্দিনের দুই ছেলে হারেজ আলী ও হাবিজুদ্দিন। বর্তমানে তাদের কেহউ বেঁচে নেই। তবে তাঁদের ওয়ারিশগণ সবাই উচ্চ শিক্ষিত। শুধু তাই নয়, সবাই সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদস্থ হয়ে আলোকিত পরিবার হিসেবে স্থানীয়ভাবে এসেছেন আলোচনায়। জড়িপমতে, সারাদেশে এমন দৃষ্টান্তের পরিবার পাওয়া বিরল। সেই আলোচিত গ্রামের নাম বংশিদা। এটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের একটি গ্রাম ও মৌজা।
সরজমিন ঘুরে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামল থেকে জামাই শশুরের বাড়ি হিসেবে পরিচিত ছিলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের দাউদপুরের বংশিদা গ্রামের।এ গ্রামের বাসিন্দা শশুর গোরাচাঁদ মাস্টার ছিলেন তৎকালীন রূপগঞ্জের নাগরী (বর্তমানে গাজীপুরের কালীগঞ্জের ) গীর্জা পরিচালিত সেন্ট জোসেফ স্কুলের শিক্ষক। তার মৃত্যকালে রেখে যাওয়া একমাত্র মেয়ে শ্রী ভবানী চাঁদ ও তার জামাতা চিন্তাহরণ দেবনাথ বসবাস করতেন ওই বাড়িতে। তারা বংশিদা মৌজার ১২ একর জমির মালিক ছিলেন। তবে নগদ টাকার প্রয়োজনে ১৯৬৩ ইং সনে ওই ১২ একর সম্পত্তি বিক্রি করে যান রোহিলা গ্রামের তৎকালীন বাসিন্দা সুমির উদ্দিনের দুই ছেলে হারেজ আলী ও হাবিজুদ্দিনের কাছে। সেই থেকে ক্রয় সূত্রে বংশিদা গ্রামের মালিক হয়ে যান দুইভাই। স্থানীয়ভাবে ওই দুইভাইয়ের গ্রাম বংশিদা এখন অঘোষিত পর্যটন স্পট।
সূত্র জানায়, বংশিদার টেকের যে কোন স্থানে মাটি খুড়লে পাওয়া যায় পোড়া মাটি ও ভাঙ্গা মাটির পাতিলের। মাঝে মাঝে সনাতনীদের বিভিন্ন উপাদানের মূর্তিও পাওয়া যায়। তবে সময়ের ব্যবধানে বর্গাচাষীদের হাতে চলে গেছে প্রাচীন নানা বস্তু।
কথা হয় বংশিদার দুৃই ভাইয়ের এক ভাই হাবিজুদ্দিনের নাতিন মেনহাজুল ইসলাম মেরাজুল মাস্টারের সঙ্গে। তিনি বেলদী দারুল হাদিস আলিয়া মাদরাসার গণিত শিক্ষক। তিনি ভাওয়াল বদরে আলম সরকারী কলেজ থেকে বিএসসি অনার্স সম্পন্ন করেন। পরবর্তিতে বিএড ট্রেনিং গ্রহণ করেন। তার পরিবার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের বংশিদা গ্রামের ১২ একর জমির পুরোটার ক্রয় সূত্রে মালিক হারেজ আলী ও তার দাদা হাবিজুদ্দিন। পূর্ব পুরুষের মালিকানায় থাকা রোহিলা, বাঘপাড়া, বেলদী মৌজায় আরো ২০ একর জমির মালিক ছিলেন তারা। তারা পেশায় কৃষক হলেও তাদের রেখে যাওয়া ওয়ারিশদের দেখিয়েছেন আলোরপথ। ফলে পরিবারের প্রতিটা সদস্য উচ্চ শিক্ষিত। এমনকি প্রায় সবাই বিভিন্ন দফতরে উচ্চ পদস্থ কর্মকতা। তবে মেয়েদের জন্য তৎকালীন শিক্ষার পরিবেশ উন্নত না থাকলেও উচ্চ শিক্ষিত হয়ে রেকর্ড করেন তারা। তাদের মাঝে হারেজ আলীর ৩ ছেলে ৪ মেয়ে এবং হাবিজুদ্দিনের ৩ ছেলে ৫ মেয়ে ।
সূত্র জানায়, হারেজ আলীর ৩ ছেলের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের মহা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এখন তিনি অবসর গ্রহণ করেছেন। আবার আব্দুর রাজ্জাকের ২ ছেলে ১ মেয়েও রয়েছেন সরকারী বেসরকারী উচ্চ পদস্থ। তার মধ্যে ডাক্তার আসাদুজ্জামান বিসিএস কর্মকর্তা এবং একজন চিকিৎসক। তিনি বাড়িটিকে ডাক্তার বাড়ি হিসেবে পরিচয় করাতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছেন। এমনকি প্রতি শুক্রবার পাশের গ্রামের দরিদ্র রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেন।রাজ্জাকের অপর ছেলে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে একটি বেসরকারী ফার্মে কাজ করছেন। একইভাবে তার মেয়ে লুৎফুন্নাহার রিমু বুয়েট থেকে প্রকৌশল সনদ নিয়ে গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
হারেজ আলীর ২য় ছেলে আব্দুল মোতালিব বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয় বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে সাবেক কর্মকর্তা ছিলেন। আবার আব্দুল মোতালিবের ৩ ছেলে আহছান হাবিব,জায়েদ আল হাবিব, সৈকত বেসরকারী ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের পরিবারের অপর সদস্য নজরুল ইসলাম একজন কৃষিবিদ। তিনি খামার বাড়ি প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত। একইভাবে নজরুল ইসলামের ১ ছেলে অর্নব ১ মেয়ে খাইরুণ জাহিন উভয়েই প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
এদিকে হাবিজুদ্দিনের ৩ ছেলে ৫ মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে মরহুম সামসুল হক ছিলেন বিমান বাহীনিতে কর্মরত এয়ারভাইস মার্সাল। ওই কর্মকর্তার দুই মেয়ে সামসুন্নাহার লাকী জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স করেন। পাশাপাশি অপর মেয়ে নুরুন্নাহার লিনা ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স,মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।
হাবিজুদ্দিনের ২য় ছেলে আনোয়ার হোসেন আমদিয়া কৃষক শ্রমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বরত। আবার তাঁর ১ ছেলে ২ মেয়ের মাঝে ছেলে আবিদ হাসান শাওন, শিমু ও রওনক জাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জণ করেন। একইভাবে হাবিজুদ্দিনের ৫ মেয়ে রওশান, নুরুন্নাহার, শেফালী, শিউলি ও আয়েশাগং উচ্চ শিক্ষা অর্জণ করলেও গৃহীনি হিসেবে রয়ে যান।
বেলদী গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান রিফাত বলেন, রূপগঞ্জের কোথাও এমন একটি আদর্শ পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেখানে সবাই শিক্ষিত। আবার একটি পরিবার তাদের জমি জমা ধরে রেখে সবাইকে উচ্চ শিক্ষিত করেছে এমন পরিবার খুঁজে পাওয়াও বিরল। তাই বংশিদার এ পরিবারটি হতে পারে অন্যসব পিছিয়ে যাওয়া বাসিন্দাদের জন্য দৃষ্টান্তসরূপ।